মধ্যযুগীয় ভারতীয় ইতিহাস বলতে আমরা প্রায় ৮ম থেকে ১৮শ শতক পর্যন্ত সময়কে বুঝি, যখন ভারতবর্ষে বিভিন্ন রাজবংশ ও সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন ঘটে। এই সময়ে দিল্লি সালতানাত ও মুঘল সাম্রাজ্যের মতো শক্তিশালী শাসনব্যবস্থা গড়ে ওঠে, যার ফলে সংস্কৃতি, স্থাপত্য ও বাণিজ্যে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। এই ইতিহাস আমাদের জানতে সাহায্য করে যে কীভাবে ভারতের বর্তমান সমাজ, ধর্ম ও ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে। আপনার জন্য এটি প্রাসঙ্গিক কারণ এই সময়ের ঘটনাগুলো আজকের ভারতের রাজনীতি ও সংস্কৃতির ভিত্তি তৈরি করেছে।
দিল্লি সুলতানি (১২০৬–১৫২৬)প্রিলিমস + মেইনস
দাস বংশ / মামলুক বংশ (১২০৬–১২৯০)
- কুতুবুদ্দিন আইবক → কুতুব মিনার নির্মাণ শুরু, “লাখবক্স” উপাধি
- ইলতুৎমিশ → সালতানাত সুদৃঢ় করেন; দিল্লিকে রাজধানী করেন; ইক্তা ব্যবস্থা চালু
- রাজিয়া সুলতানা → প্রথম মহিলা সুলতান; রাজ্যাভিষেক পর্দা ছেড়ে
- বলবন → “রক্ত ও লৌহ” নীতি; সিজদা ও পাইবোস প্রথা চালু
খলজি বংশ (১২৯০–১৩২০)
- জালালউদ্দিন খলজি → প্রতিষ্ঠাতা, উদার শাসক
- আলাউদ্দিন খলজি → সর্বোচ্চ ক্ষমতাশালী সুলতান
- বাজার সংস্কার → ৪টি বাজার — শস্য, কাপড়, পশু, সাধারণ পণ্য; মূল্য নিয়ন্ত্রণ
- সেনা সংস্কার → দাগ ও হুলিয়া পদ্ধতি (ঘোড়া চিহ্নিতকরণ ও সৈন্যের বিবরণ)
- দক্ষিণ অভিযান → মালিক কাফুরের নেতৃত্বে দেবগিরি, তেলেঙ্গানা, মাদুরাই জয়
- মঙ্গোল আক্রমণ প্রতিহত → ৫ বার মঙ্গোল আক্রমণ ব্যর্থ করেন
তুঘলক বংশ (১৩২০–১৪১৪)
- গিয়াসউদ্দিন তুঘলক → প্রতিষ্ঠাতা, প্রথম তুঘলকাবাদ নির্মাণ
- মহম্মদ বিন তুঘলক → “পাগল রাজা” / “বিচক্ষণ মূর্খ”
- রাজধানী স্থানান্তর → দিল্লি → দৌলতাবাদ (১৩২৭); পরে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসেন
- প্রতীক মুদ্রা → তামার মুদ্রা রুপার সমান মূল্য — চরমভাবে ব্যর্থ
- দোয়াব করবৃদ্ধি → দুর্ভিক্ষের সময় কর বাড়ানো — জনরোষ
- ফিরোজ শাহ তুঘলক → সেচখাল, হাসপাতাল, বিদ্যালয় নির্মাণ; দাসপ্রথার বিস্তার
সৈয়দ ও লোদি বংশ
- সৈয়দ বংশ (১৪১৪–১৪৫১) → তৈমুরের আক্রমণের পর দুর্বল শাসন
- বহলুল লোদি → আফগান লোদি বংশের প্রতিষ্ঠাতা
- ইব্রাহিম লোদি → পানিপথের ১ম যুদ্ধে বাবরের কাছে পরাজিত ও নিহত (১৫২৬)
গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি → ইবন বতুতা (মরক্কোর পর্যটক, মহম্মদ বিন তুঘলকের সময়); আমীর খসরু (সুফি কবি, কাওয়ালি উদ্ভাবক)
মুঘল সাম্রাজ্য (১৫২৬–১৭০৭)প্রিলিমস + মেইনস
বাবর (১৫২৬–১৫৩০)
- পানিপথের ১ম যুদ্ধ (১৫২৬) → ইব্রাহিম লোদিকে পরাজিত; গোলন্দাজ বাহিনী ব্যবহার
- খানুয়ার যুদ্ধ (১৫২৭) → রাণা সংগ্রাম সিংহকে পরাজিত
- তুলুকমা পদ্ধতি → যুদ্ধকৌশল; তুজক-ই-বাবরি (বাবরনামা) রচনা
হুমায়ুন (১৫৩০–৫৬)
- চৌসার যুদ্ধ (১৫৩৯) ও কনৌজের যুদ্ধ (১৫৪০) → শেরশাহ সুরির কাছে পরাজিত
- ১৫ বছর নির্বাসন → ইরান, আফগানিস্তান
- শেরশাহের মৃত্যুর পর পুনরুদ্ধার (১৫৫৫)
- গ্রন্থাগারের সিঁড়ি থেকে পড়ে মৃত্যু (১৫৫৬)
শেরশাহ সুরি (১৫৪০–৪৫)
- গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড (কলকাতা থেকে পেশোয়ার) নির্মাণ
- রুপিয়া মুদ্রা চালু (চাঁদির), ডাক ব্যবস্থা, সরাইখানা
- ভূমি জরিপ ও রাজস্ব সংস্কার → আকবরের মডেল
আকবর (১৫৫৬–১৬০৫)
- পানিপথের ২য় যুদ্ধ (১৫৫৬) → হেমুকে পরাজিত; বৈরাম খানের অভিভাবকত্ব
- রাজপুত নীতি → বিবাহসম্পর্ক, উচ্চ পদে নিয়োগ (মান সিংহ, টোডরমল, বীরবল)
- মনসবদারি ব্যবস্থা → সামরিক ও বেসামরিক র্যাঙ্কিং (জাট ও সওয়ার)
- টোডরমল → জাব্তি পদ্ধতি (ভূমি জরিপ ও রাজস্ব নির্ধারণ)
- দীন-ই-ইলাহি (১৫৮২) → সর্বধর্ম সমন্বয়ের চেষ্টা
- ইবাদতখানা → বিভিন্ন ধর্মের আলোচনা গৃহ (ফতেপুর সিক্রি)
- জিজিয়া কর বিলোপ (১৫৬৪)
- নবরত্ন → বীরবল, টোডরমল, আবুল ফজল, ফৈজি, তানসেন, মান সিংহ, আব্দুর রহিম প্রমুখ
জাহাঙ্গীর (১৬০৫–২৭)
- ন্যায়ের শিকল → প্রজারা সরাসরি সম্রাটের কাছে অভিযোগ জানাতে পারত
- চিত্রকলার পৃষ্ঠপোষক; তুজক-ই-জাহাঙ্গিরি রচনা
- নুরজাহান → প্রকৃত ক্ষমতাধর; মুদ্রায় নাম, শিকারে দক্ষ
শাহজাহান (১৬২৮–৫৮)
- তাজমহল → মমতাজের স্মৃতিতে (১৬৩১–৫৩); উস্তাদ আহমদ লাহোরি স্থপতি
- ময়ূর সিংহাসন, দিল্লির লাল কেল্লা, জামা মসজিদ
- “স্থাপত্যের রাজপুত্র” উপাধি
- পুত্র আওরঙ্গজেব কর্তৃক বন্দী, আগ্রায় মৃত্যু
আওরঙ্গজেব (১৬৫৮–১৭০৭)
- জিজিয়া পুনরায় চালু (১৬৭৯)
- হিন্দু মন্দির ধ্বংস ও নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা
- দাক্ষিণাত্য নীতি → ২৭ বছর দাক্ষিণাত্যে যুদ্ধ → সাম্রাজ্য দুর্বল
- শিবাজির সঙ্গে দীর্ঘ সংঘর্ষ
- মৃত্যুর পর মুঘল সাম্রাজ্যের দ্রুত পতন
মুঘল পতনের কারণ → আওরঙ্গজেবের কঠোর নীতি, উত্তরাধিকার দ্বন্দ্ব, মারাঠা শক্তির উত্থান, নাদির শাহের আক্রমণ (১৭৩৯), ইউরোপীয় শক্তির প্রভাব
ভক্তি ও সুফি আন্দোলনপ্রিলিমস + মেইনস
ভক্তি আন্দোলন
- উৎস → দক্ষিণ ভারতের আলোয়ার ও নায়নার সন্তরা (৬ষ্ঠ–৯ম শতক)
- রামানুজ → বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শন, বৈষ্ণব ভক্তির ভিত্তি
- রামানন্দ → উত্তর ভারতে ভক্তি আন্দোলন, কবীরের গুরু
- কবীর → হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের বার্তা; দোঁহা রচনা; জুলাহা পরিবারে বড়
- গুরু নানক → শিখ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা; এক ঈশ্বর, জাতিভেদ বিরোধী
- চৈতন্য মহাপ্রভু → বাংলায় বৈষ্ণব আন্দোলন; কীর্তন ও নামসংকীর্তন; রাধা-কৃষ্ণ ভক্তি
- মীরাবাই → রাজপুত রানি; কৃষ্ণভক্তি; ভজন রচনা
- তুকারাম → মহারাষ্ট্রে ভক্তি; অভঙ্গ রচনা
- সাধারণ বার্তা → জাতিভেদ বিরোধী, ঈশ্বরের কাছে সবাই সমান, প্রেম ও ভক্তিই মুক্তির পথ
সুফি আন্দোলন
- চিশতি সিলসিলা → মঈনুদ্দিন চিশতি (আজমির), নিজামুদ্দিন আউলিয়া (দিল্লি) — সবচেয়ে জনপ্রিয়
- সুরওয়ার্দি সিলসিলা → সিন্ধু ও পাঞ্জাবে প্রভাব
- নকশবন্দি সিলসিলা → আওরঙ্গজেবের উপর প্রভাব; মুঘল আমলে গুরুত্বপূর্ণ
- কাদিরি সিলসিলা → দক্ষিণ ভারতে
- খানকাহ → সুফি আস্তানা
- দর্শন → ওয়াহদাত-আল-উজুদ (সর্বেশ্বরবাদ); প্রেম ও আত্মসমর্পণ